আমিই সেই তন্নি – পর্ব ১৪

 



আমিই সেই তন্নি – পর্ব ১৪

✍️ লেখিকা: সুমি আক্তার


সকাল হতে না হতেই সবাই চলে গেলো। স্যার মাঝরাতেই বেরিয়ে গেছেন।

আমি একা বসে কিছু কাজ সারছিলাম। হঠাৎ আলিফ ফোন করে মোটা অঙ্কের টাকা চাইলো। বললো—


> ঘরে তিন মাসের ভাড়া বাকি।

বাড়িওয়ালা বাবাকে ঘর ছাড়তে বলেছে।

ঘরে ফ্যান নেই, বাজার নেই, খালি মেঝেতে ঘুমাতে হয়।

পানি দূষিত, খাওয়ার মতো কিছু নেই।




সব কিছু ঠিক করার জন্য আমার কাছেই টাকা চাইছে।

আমি স্পষ্ট বললাম—


“আমি কেন তোমার বাবার ঘরের ভাড়া দেবো?

আমায় কি টাকার মেশিন ভেবেছো?

এক সংসার আমার, আবার তোমাদের নাটকের সংসারও টানবো আমি?

বাবার কাছে থেকেও যদি আমার টাকাতেই চলতে হয়, তবে ওখানে থাকার কোনো মানেই নেই।

একবার মানবিকতার খাতিরে দিয়েছিলাম, এবার আর পারবো না।”


আমার কথা শুনে আলিফ কল কেটে দিলো।

আমি জানি, আমি ভুল বলিনি।



---


একাকিত্ব আর অস্থিরতা


এসব সন্তানদের যন্ত্রণায় আমার পাগল হয়ে যাওয়ার উপক্রম।

ডাক্তার বলেছেন আমাকে টেনশন নেওয়া চলবে না।

কিন্তু সন্তানরাই আজ আমাকে সবচেয়ে বেশি দুঃশ্চিন্তায় রাখে।


মাথা ধরে সোফায় বসেছিলাম। ভাবি এসে হাতে এক কাপ চা ধরিয়ে পাশে বসলেন।

তিনি সোজা বললেন—


“ছেলে-মেয়ের দায়িত্ব তুমি অনেক দিনই পালন করেছো। এবার নিজের জীবনটাকে ভেবে দেখো। স্যার তোমাকে পছন্দ করে, বিয়ে করতে রাজি। এবার তুমিও প্রস্তুত হও।”


আমি চমকে উঠলাম। ভাবি শান্তভাবে বললেন—


“তুমি একা একা কষ্ট পাচ্ছো। সন্তানরা জানে, যাই করুক তুমি তাদের আগলে নেবে। এজন্য সাহস পেয়েছে। তারা অবহেলা করছে তোমাকে, তবুও তুমি শক্ত হতে পারছো না। কিন্তু তুমি আর একা থাকতে পারবে না। তোমারও একজন সঙ্গী দরকার। জীবনে আরেকটা সুযোগ দাও।”


আমি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম—


“আমার এখন কী করা উচিত ভাবি?”


তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন—


“বিয়ে করো। সুখে-দুঃখে কাউকে পাশে পাও। সন্তানরা যেমন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছে, তুমিও তোমার জীবনকে নতুন করে সাজাও।”



---


নতুন জীবনের সিদ্ধান্ত


সেদিন সন্ধ্যায় স্যারের সঙ্গে আমার সরাসরি কথা হলো।

স্যার বললেন—


“আমাদের দুজনেরই অনেক কষ্টের অভিজ্ঞতা আছে। আমরা বুঝি সম্পর্কের মূল্য কতখানি। আমি তোমাকে কখনো চাপ দেবো না। শুধু চাই, তুমি ভালো থেকো।”


আমি এক মুহূর্ত চুপ থেকে হাসলাম, তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম—


“তাহলে নতুন জীবনের সূচনায় এগিয়ে যাওয়া যাক।”


স্যার আমার হাত ধরলেন। আমরা দুজনেই দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম।



---


সন্তানদের বিরোধিতা


খবর ছড়িয়ে পড়তেই আকাশ, আলিফ আর অর্নি বাড়িতে এলো।

আকাশ চিৎকার শুরু করলো—


“এ বয়সে তুমি বিয়ে করবে? তোমার চরিত্র খারাপ! সমাজে আমাদের হাসির খোরাক বানাচ্ছো।”


আমি প্রতিবাদ করলাম—


“তুমি করলে দোষ নেই, আমি করলে চরিত্র খারাপ?

আমার জীবন, আমি যেভাবে চাই সেভাবে কাটাবো।”


আকাশ আমাকে আঘাত করতে তেড়ে এলো।

স্যার সাথে সাথেই তাকে থামিয়ে দিলো—


“তিনি আমার হবু স্ত্রী। উনার প্রতি আপনি অমানবিক হতে পারেন না।”


আলিফও তীর্যক কথা ছুঁড়লো—


“আম্মু, যদি বিয়ে করারই ছিল, আগে করোনি কেন? এখন আমাদের বড়ো হওয়ার পর কেন?”


আমি থামলাম না। স্পষ্ট বললাম—


“আমি একা কতটা কষ্ট করেছি, তা তোমরা জানো না।

তোমাদের জন্য আমার সব স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছি।

আজ আমি যদি একটুখানি নিজের জন্য ভাবতে চাই, তাতে দোষ কোথায়?

আমি মা হিসেবে আমার দায়িত্ব পালন করেছি। এখন সন্তান হিসেবে তোমরা কি আমার দায়িত্ব পালন করছো?”



---


শেষ কথা


আমি দৃঢ় কণ্ঠে বললাম—


“আমার জীবন, আমার সিদ্ধান্ত।

আমি এবার নিজের জন্য বাঁচবো।

স্যার, আপনি আপনার পরিবারের সঙ্গে কথা বলুন।

সব ঠিক থাকলে সামনের সপ্তাহেই আমাদের বিয়ে হবে।”


আমার চোখে আর ভয় নেই।

আমি আর কারো অবহেলায় ভাঙবো না।

তন্নি এবার নিজেকে নিয়ে বাঁচবে, নিজের সুখ খুঁজবে।



---


✍️ লেখিকা: সুমি আক্তার

👉 সম্পূর্ণ গল্প ও নিয়মিত আপডেট পেতে আমার পেইজ Sumi Akhtar ফলো করুন।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url

sr7themes.eu.org