গল্পঃ- গোলাপ সুন্দরী। পর্বঃ- ০১ Sumi Akhtar
গল্পঃ- গোলাপ সুন্দরী।
পর্বঃ- ০১
Sumi Akhtar
রাতে খাবার সময় আমার স্বামী বললো, তোমার এক্স বয়ফ্রেন্ড আজ আমার অফিসে দেখা করতে এসেছিল। সে নাকি এখনো তোমাকে ভালোবাসে।
কথাটা শুনেই আমার ভাত গলায় আটকে গেল। আমি দুবার কাশি দিলাম, ফাহিম (স্বামী) পানির গ্লাস এগিয়ে দিল।
ফাহিম আবার বললো,
- লোকটাকে আমার বেশি সুবিধার মনে হচ্ছিল না কেন জানি। সবকিছু কেমন মিথ্যা মনে হয়েছে।
আমি বললাম,
- আপনার সঙ্গে দেখা করেছে কীভাবে? আপনি তো সচারাচর সবার সঙ্গে দেখা করেন না।
- সে তোমার বন্ধু হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে এসেছে। তারপর আর অমত করিনি, তুমি তো জানো তোমার গুরুত্ব আমার কাছে সবচেয়ে বেশি।
- কতক্ষণ ছিল?
- ঘন্টা খানিক।
- এতক্ষণ ধরে তার সঙ্গে কিসের কথা বলেছেন?
- তুমি তো এসব কিছু বলো নাই, তাই ওনার কাছ থেকে শুনলাম। আমারও তেমন কাজের চাপ ছিল না তাই শুনলাম বসে বসে।
আমার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। ঘন্টা খানিক ধরে সে কি কি বলছে সেটাই বুঝতে পারছি না। আমি নিজ থেকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছি না।
বিয়ের আগে আমি একজনকে ভালোবাসতাম এটা সত্যি। ওর নাম ছিল নাদিম হোসেন। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে আমাদের বিয়েটা হয়নি। তবে নাদিম নিজেও আমার থেকে অনেকটা দুরে চলে গেছে তখন।
কিন্তু আজ আট বছর পরে হঠাৎ কি কারণে সে ফাহিমের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে?
সে তো সরাসরি আমার সঙ্গে কথা বলতে পারতো কিন্তু তা না করে ফাহিমের কাছে কেন?
- রুমকি কি ঘুমিয়ে গেছে?
আমাদের একমাত্র মেয়ের নাম রুমকি।
- হ্যাঁ ঘুমিয়ে গেছে।
- মনে করো আমি যদি এখন আঘাত করি, মারি তাহলে তুমি কি করবে?
আমি চুপ করে রইলাম। ফাহিমের খাবার শেষ হয়ে গেছে, সে উঠতে উঠতে বললো,
- খাওয়া শেষ করে এক কাপ ঠান্ডা কফি নিয়ে বেলকনিতে আসো। কথা আছে তোমার সঙ্গে।
ফাহিম চলে গেল। আমি আর কিছু খেতে পারলাম না। সবকিছু রান্না ঘরে রেখে কফি বানালাম। তারপর কফি নিয়ে বেলকনিতে গেলাম, ফাহিম সিগারেট ধরিয়ে বসে আছে।
ফাহিম বাহিরের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো,
লাঞ্চ টাইমের কিছুক্ষণ আগে নাদিম সাহেব আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে। আমি তার সঙ্গে করমর্দন করে বসতে বললাম। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে একটা চুমুক দিয়ে সে বললো,
- আমি আপনার স্ত্রীর সাবেক প্রেমিক। আমি শুধু তার বন্ধু নয়, ভালোবাসার মানুষ ছিলাম। এখনো তাকে অনেক ভালোবাসি আমি।
আমি বললাম,
- তাহলে বিয়ে করেননি কেন? আমি তো এসব জানতাম না।
- করতে চেয়েছিলাম কিন্তু আমার পরিবার থেকে সমস্যা ছিল তাই করতে পারিনি। আপনার স্ত্রী মানে নাতাশা রাজি ছিল পালিয়ে যাবে আমার সঙ্গে। কিন্তু আমি তাকে নিয়ে পালাতে পারিনি।
- ওহ্ আচ্ছা, তাহলে তো নিশ্চয়ই ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাহলে আবার কেন এসেছেন?
- আট বছরের মধ্যে আমার অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। স্বভাব চরিত্র খুব খারাপ হয়ে গেছে।
- তো?
- আপনি অনেক বড়লোক, আপনার টাকার কোনো অভাব নেই। তাছাড়া আমার ভালোবাসার মানুষটাও আপনার কাছে।
- আচ্ছা।
- আপনি সবদিক থেকে সুখী মানুষ, তাই আমিও একটু সুখে থাকতে চাই।
- কেউ কি নিষেধ করেছে?
- আপনি যদি বেশ কিছু টাকা আমাকে দিতেন তাহলে আমিও একটু সুখে থাকার চেষ্টা করবো।
- আমি টাকা কেন দেবো?
- আপনার একটা সম্মান আছে, আমার কিছুই নেই। তাই আপনি নিজের সম্মান বাঁচানোর জন্য টাকা দিবেন।
- আমার সম্মান কেন নষ্ট হবে?
- পরিকল্পনা করে কাউকে অসম্মান করতে চাইলে সেটা অবশ্যই করা সম্ভব। আমিও সেটাই করবো।
- ঠিক আছে আপনি আপনার চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারেন কোনো আপত্তি নেই।
- আপনি কি আমাকে টাকা দিবেন না?
- নাতাশার বাবার কাছ থেকে কতো টাকা নিয়ে তারপর পথ থেকে সরে গেছেন?
- আপনি কীভাবে জানেন?
- অনুমান করে। আপনি যেহেতু আমার কাছে টাকা চাইতে এসেছেন সেহেতু এরকম কিছু কাজ আগেও করেছেন বলে মনে হচ্ছে। হয়তো সেদিন নাতাশার বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে তার জীবন থেকে সরে গেছেন।
- বেশ বুদ্ধিমান আপনি। ঠিকই বুঝতে পেরেছেন।
- দেখুন মিস্টার নাদিম হোসেন, আমার যথেষ্ট ধৈর্য ধরার ক্ষমতা আল্লাহ দিয়েছেন। আপনি যদি মনে করেন যে আমি আপনার কথায় বিচলিত হবো তাহলে ভুল করছেন।
- আমার কাছে দ্বিতীয় রাস্তা আছে।
- যেমন?
- একসঙ্গে দুটো বলা যাবে না, প্রথম পদ্ধতি কাজ না করলে তারপর দ্বিতীয় পদ্ধতি।
- ঠিক আছে, আরেক কাপ চা খাবেন?
নাদিম সাহেব কিছু না বলে তখন আমার চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল। আমি তার চিন্তা মাথা থেকে সম্পুর্ন বের করে দিলাম। আটত্রিশ বছর বয়সে এসে স্ত্রীর প্রাক্তনকে নিয়ে মাথা ব্যথা করার কোনো প্রয়োজন মনে করিনি।
এটুকু বলেই ফাহিম থামলো। ততক্ষণে তার হাতে থাকা কফি শেষ হয়ে গেছে। ঘড়িতে তখন রাত বারোটার বেশি বেজে গেছে। এখন আমাদের ঘুমানোর সময় হয়ে গেছে, আমি কিছু বলার আগেই ফাহিম চেয়ার ছেড়ে উঠে গেল।
প্রসঙ্গটা নিয়ে আমার কথা বলতে সাহস হচ্ছে না। কিন্তু নাদিম কি সত্যি সত্যি বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে এটা মগজে ঘুরছে। ভাবলাম বাবার কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে। আর সত্যি সত্যি যদি বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে থাকে তাহলে তো নাদিম আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে।
বিছানায় শুয়ে ফাহিম বললো,
- নাদিম সাহেবের সাথে বিকেলে আবার কথা হয়েছে আমার।
- কি কথা?
- সে আমার নাম্বারে কল করেছিল। তারপর সে আমাদের রুমকিকে কিডন্যাপ করার হুমকি দেয়।
এবার আমার বুকটা কেঁপে উঠল। আমি অন্ধকারে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম৷ পরবর্তী কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।
- লোকটা খুব খারাপ বলে মনে হচ্ছে, তাছাড়া তার মনের মধ্যে লুকানো কোনো রহস্য আছে বলে আমার ধারণা।
- আপনি কি তাকে টাকা দিতে রাজি হয়েছেন?
- একটা কথা বলবো?
- বলেন।
- তোমার সঙ্গে নাদিম সাহেবের কথা হয়েছে? এসব পদ্ধতি তুমি তাকে শিখিয়ে দিয়েছ তাই না নাতাশা?
আমার কলিজা কাঁপিয়ে গেল তার এই কথা। আমি কি বলবো বুঝতে পারছি না, শুধু ঠোঁট নেড়ে বললাম,
- আপনি কি বলেন এসব?
- নাদিম সাহেব যে নাম্বারে আমাকে কল দিয়েছে সেটা আমার একান্তই পারসোনাল নাম্বার। তুমি আর মা ছাড়া আর কেউ কল করে না কারণ এই নাম্বার কারো কাছে নেই। সুতরাং সে আমার এই নাম্বার কোথায় পেয়েছে?
- কিন্তু তাই বলে আমি কেন দেবো?
- সেটাই তো জানতে চাই। তুমি কেন তাকে নাম্বার দেবে, রুমকিকে কিডন্যাপ করার বুদ্ধি দেবে।
- আমার সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি।
- ঠিক আছে কার সঙ্গে কথা হয়েছে আর কার সঙ্গে কথা হয়নি সেটা তো আমি বের করবো। এখন তবে ঘুমাও। আর ঘুমের আগে একটা কথা বলি, এসব করে কোনো লাভ নেই। এতবছর পরে প্রাক্তনের সঙ্গে পালানোর পরিকল্পনা করে মস্ত বড়ো বোকামি করবা।
আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। সে আমাকে কোনো সুযোগ না দিয়ে চুপ হয়ে গেল। আমি আর ঘুমাতে পারিনি, শুধু ভাবতে লাগলাম কীভাবে ফাহিমকে বোঝাবো। আর নাদিম কেন এরকম শুরু করেছে।
রাত তিনটার দিকে আমাদের কলিং বেল বেজে ওঠে। আমি সজাগ ছিলাম, ফাহিমকে ডাক দিয়ে ঘুম থেকে জাগ্রত করলাম। তারপর বাতি অন করে ফাহিম চলে গেল দরজার দিকে। দরজা খুলে দেবার আগে সে দেখলো দরজার ওপাশে অনেক পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। ফাহিম আমাকে বললো,
- পুলিশ এসেছে কেন?
- আমি বললাম, জানি না তো।
- তুমি ভিতরে যাও আমি দেখি।
আমি ভিতরে এসে পর্দা ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। ফাহিম দরজা খুলে দিল, ১০/১২ জন পুলিশ বাসার মধ্যে প্রবেশ করলো।
পুলিশের কথা ছিল এলোমেলো, তবে সেটুকু সাজিয়ে বললে এরকম হয়,
নাদিম খুন হয়েছে বিকেলে। যে বাসায় সে থাকতো সেই বাসাতেই তার লাশ পাওয়া গেছে। বিকেলে ফাহিম নাকি নাদিমের বাসায় গিয়েছিল, পুলিশ এতক্ষণ ধরে তদন্ত করে আমাদের বাসা খুঁজে বের করেছে। ফাহিমকে সেই বাসা থেকে বের হবার সময় বেশ নার্ভাস লেগেছে। দারোয়ান ও সিসিটিভি ফুটেজ দেখে পুলিশের ধারণা যে ফাহিমই খুনটা করেছে।
আমি তাড়াতাড়ি নাইটড্রেস পরিবর্তন করে ড্রইং রুমে গেলাম। পুলিশ ততক্ষণে ফাহিমকে নিয়ে যাবার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে।
ফাহিম আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
- বিশ্বাস করো আমি কিছু করিনি। বিকেলে সেই বাসায় আমি ঠিকই গিয়েছি কিন্তু তার বাসায় সে তখন লাশ হয়ে পরে ছিল।
পুলিশ ফাহিমকে নিয়ে যাচ্ছে। আমিও তাদের সঙ্গে সঙ্গে নিচে গেলাম। কোনো লাভ হবেনা জেনেও বারবার অনুরোধ করতে লাগলাম। কিন্তু পুলিশ ফাহিমকে নিয়ে চলে গেল। আমি তাড়াতাড়ি করে উপরে এলাম, এখনই আমার শাশুড়ী ও সবাইকে জানানো দরকার।
বাসায় ফিরে বেডরুমে গিয়ে মোবাইল নিতে গিয়ে দেখি আমার মেয়ে রুমকি বিছানায় নেই। পাঁচ বছর বয়সী রুমকি হঠাৎ কোথায় গেল? তাকে তো ঘুমে দেখে গেলাম কিন্তু এখন গেল কোই?
আমি সম্পুর্ন বাসার মধ্যে খুঁজে দেখলাম কিন্তু কোথাও পেলাম না। আমার কান্না পেতে লাগলো, মোবাইল হাতে নিয়ে কল দিতে গিয়ে দেখি তিনটা মিসডকল।
অপরিচিত নাম্বার তবুও কলব্যাক করলাম।
ওপাশ থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠে বলে উঠলো,
- তোমার মেয়ে আমার কাছে নাতাশা। স্বামীর জন্য চিন্তা না করে মেয়ের জন্য চিন্তা করো।
- কে আপনি?
- আমার তোমার কেউ নয়, ভার্সিটি জীবনের কিছু ভুলের সাজা তোমাকে পেতে হবে। প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারো, মিস গোলাপ সুন্দরী।
চলবে....
গল্পঃ- গোলাপ সুন্দরী।
পর্বঃ- ০১
Sumi Akhtar

