নিলয়ের_প্রণয়িনী পর্ব – ১৬ লেখা: সুমি আক্তার


 


নিলয়ের_প্রণয়িনী

পর্ব – ১৬
লেখা:  সুমি আক্তার

হিয়াদের গাড়ি ছুটে চলছে উপজেলা শহরের পথে। পশ্চিম আকাশে সূর্য ধীরে ধীরে লালাভ রঙে রঙিন হয়ে নেমে আসছে দিগন্তের দিকে। হিয়ার বাড়ি থেকে বেরিয়েছে প্রায় ঘন্টাখানেক হলো।
হিয়ার মা সুমিতা বেগম বহু অনুরোধ করেছিলেন আরও একদিন থেকে যেতে। হিয়াও চেয়েছিল, কিন্তু নিলয়ের নির্দেশ অমান্য করার সাহস কারও হয়নি।

মনের ভেতরে হিয়ার কেমন এক শূন্যতা—স্বাভাবিকই তো, প্রিয়জনদের ছেড়ে দূরে চলে যাওয়া কাকে না কষ্ট দেয়!
পাশে বসা জাইমা ওকে কখনো গল্পে, কখনো খুনসুটিতে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছে। জেরিন আর আনায়া, দুই বোন, নিজেদের মধ্যে নিমগ্ন। তবে জেরিনকে আজ যেন অস্থির অস্থির লাগছে—চোখে মুখে অদ্ভুত এক অচেনা ছায়া।

ড্রাইভারের পাশের সিটে বসা রকিব গম্ভীর চেহারায় কথা বলছে। নিলয়ের নির্দেশে হিয়াদের সঙ্গে এসেছে সে। যাওয়া-আসা মিলিয়ে সবার খোঁজখবরই সে নিয়েছে, তবে হাসিঠাট্টা শুধু হয়েছে চেনা জাইমার সঙ্গেই।
যাত্রার শুরুতে রকিব খেয়াল করেছিল—একটা গাড়ি তাদের পিছু নিচ্ছে। শহর ছাড়ার পর আর চোখে পড়েনি ঠিকই, কিন্তু কিছুদিন আগের পার্কের ঘটনাটা, আর আসলাম খন্দকারের ক্রোধ—এসব মিলিয়ে তার মনে কেমন যেন সন্দেহ দানা বেঁধে আছে। আজ নিলয় হাসপাতালের কাজে ব্যস্ত, তাই রকিব ভাবল, “আমি তো আছিই, ভাইকে অযথা দুশ্চিন্তা দিয়ে লাভ কি?”

গাড়ি এসে পৌঁছল উপজেলা শহরের ওয়ান-বাই-ওয়ান রোডে। রাস্তার পাশেই এক মনোমুগ্ধকর রেস্টুরেন্ট, সামনেই বিশাল ব্রিজ—তার নিচে অবারিত জলরাশি, ঢেউয়ের গায়ে বিকেলের লাল সূর্যের আলো নেচে বেড়াচ্ছে।

হঠাৎ জেরিন উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল—
“ওই দেখো! রাস্তার ওপারে দারুণ সুন্দর দু’তলা রেস্টুরেন্ট! আমরা একটু ঘুরে আসি না?”

রকিব ভ্রু কুঁচকে পিছনে তাকাল—
“এভাবে হঠাৎ চিৎকার করা ঠিক না, এক্সিডেন্ট হয়ে যেতে পারত!”

কিন্তু জেরিনের মুখে উচ্ছ্বাস থামল না।
জাইমা হাসিমুখে যোগ করল—
“চলো না সবাই মিলে, আমার ট্রিট!”

রকিব যতই নিষেধ করুক, “লেডিস পার্টির” সামনে তার কথা ধোপে টিকল না। অবশেষে ড্রাইভার সুমনসহ সকলে ওভারব্রিজ পেরিয়ে রেস্টুরেন্টে ঢুকল।


এদিকে…
ঢাকা যাওয়ার পথে নিলয়ের গাড়ি যেন উড়ছে। রকিবের ফোনে বারবার কল যাচ্ছে—কিন্তু মোবাইল সুইচড অফ। আসিফ ড্রাইভার সুমন ও হিয়ার নম্বরে ফোন করেও একই অবস্থা।

আসিফের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। ঘণ্টাখানেক আগে খবর এসেছে—কেউ নাকি হিয়াদের গাড়ির পিছু নিচ্ছে। তাতে যোগ হয়েছে আরও এক আতঙ্ক—আসলাম খন্দকারের ছেলে শাহজালাল সদ্য আমেরিকা থেকে দেশে ফিরেছে। তার সঙ্গে নিলয়ের রক্তক্ষয়ী শত্রুতা বহু দিনের।

নিলয়ের কণ্ঠ কাঁপছে, হাত শক্ত করে স্টিয়ারিং ধরা—
“আসিফ! সুমনের লোকেশন ট্র্যাক কর—ফাস্ট!”

আসিফ স্ক্রিনে চোখ রেখে বলল—
“একটা রেস্টুরেন্টে আছে… হয়তো বিশ মিনিট লাগবে পৌঁছাতে।”

নিলয়ের চোখে রাগের আগুন—
“আমার হিয়ার কিছু হলে, রকিবকে আমি ওখানেই কবর দেব!”


রেস্টুরেন্টের ভেতরে
জেরিন, হিয়া আর জাইমা ঘুরে ঘুরে দেখছে। আনায়া টেবিলে বসে ফোনে মগ্ন। রকিবের মুখে বিরক্তি—তার মনে হচ্ছে, অকারণে সময় নষ্ট হচ্ছে। পকেট থেকে ফোন বের করতেই দেখে সুইচড অফ! সুমনের ফোন ধার নিয়ে সময় দেখল।

এদিকে জেরিন টেনে হিয়াকে নিয়ে গেল রেস্টুরেন্টের দ্বিতীয় তলায়। কর্নারের রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে সামনের অসীম জলরাশির দৃশ্য উপভোগ করছে তারা। সন্ধ্যার আলো, গানবাজনা—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম পরিবেশ।

হঠাৎ জেরিন বলল—
“তুমি জানো, ছোটবেলা থেকেই আমি নিলয় ভাইয়ের প্রতি দুর্বল ছিলাম। কিন্তু ভাইয়া কখনো আমায় সেভাবে দেখেনি… এখনও না।”

হিয়া অবাক। কথা বদলে দিল—
“থাক, এসব বাদ দাও। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, নিচে চল।”

কিন্তু জেরিন হাসল—
“আরো কিছুক্ষণ থাকি। কয়েকটা ছবি তুলে যাই।”

ব্যাগ থেকে ফোন খুঁজে পেল না সে। হিয়ার ফোনও নেই। দু’জনেরই হয়তো গাড়িতে পড়ে গেছে। হিয়া নামতে উদ্যত হলে, জেরিন পেছন থেকে ডাকল—
“আমার পছন্দ না, আমি যাকে চাই সে অন্য কাউকে চাইবে।”

হিয়া কিছু বুঝে উঠতে না পেরে চলে গেল।
রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল জেরিন। ঠোঁটে বিকৃত হাসি—
“কাউকে না পাওয়ার কষ্ট নিয়ে বাঁচার চেয়ে, তাকে চিরতরে হারিয়ে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া ভালো।”

ব্যাগ থেকে বের করল এক মোবাইল—দূর জলের গভীরে ছুঁড়ে ফেলল।
“যে আমায় ভালোবাসবে না, সে অন্য কাউকেও পাবে না।”

ফুলের পাপড়ির মতোই ছিঁড়ে ফেলল শেষ বিন্দু কোমলতা। মুখে এক অচেনা, হিংস্র ছায়া—
"It was all lie, lie, lie!"

চলবে…



Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url

sr7themes.eu.org