ইতিয়া #সুমি আক্তার #পর্ব ১


 আমার বউ মরার ৪দিন হতে না হতেই, আমি লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে ড্যাঙ ড্যাঙ করতে করতে, আরেকটা বউ নিয়ে এলাম। আমি মনে মনে খুব করে চাইতাম ইতি মারা যাক। কারন ইতিকে আমার একটু পছন্দ নয়। মায়ের পছন্দের উপর না বলার ক্ষমতা আমার ছিলো না তাই না বলতে পারিনি। মেয়েটি কালো হলেও দেখতে মায়াবী ছিলো। মাথায় ছিলো লম্বা চুল। হাসলে মনে হতে মুক্ত ঝড়ছে। তবে শিক্ষাদিক্ষা তেমন ছিলো না। আমার বন্ধুদের বউরা কতো মডার্ণ কতো শিক্ষিত আর সেখানে আমার বউ একটা গেয়ো ভুত। আমি যতবার নামাজ পরতাম ক্ষোদাকে বলতাম আল্লাহ এই মুর্খ মহিলার থেকে আমাকে মুক্তি দাও।


খোদা বোধহয় আমার প্রার্থনা একটু বেশিই মন দিয়ে শুনেছিলেন। মুক্তির পথটা যে এভাবে খুলে যাবে, তা আমি কল্পনাও করিনি। ইতি মারা যাওয়ার পর আমার মধ্যে শোকের লেশমাত্র ছিলো না। বরং বুকের উপর থেকে যেন বিশাল একটা পাথর নেমে গেল। লোকে আমার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছিল, কানাঘুষা করছিল, কিন্তু তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। সমাজ বা লোকের কথা ভেবে নিজের জীবনটা তো আর নষ্ট করতে পারি না।


ইতির সাথে আমার বিয়ের দিনটা আজও মনে আছে। মা যখন বললেন, "বাবা, তোর জন্য একটা মেয়ে দেখেছি। লক্ষ্মী, সংসারী আর রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতী।" আমি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, আমার মতো একজন শিক্ষিত, আধুনিকমনস্ক ছেলের জন্য মা নিশ্চয়ই মানানসই কাউকে খুঁজেছেন। কিন্তু ইতিকে প্রথম দেখার দিনই আমার সব স্বপ্ন ধুলোয় মিশে গিয়েছিল। শ্যামলা গায়ের রঙ, সাধারণ সুতির শাড়ি পরা একটা মেয়ে মাথা নিচু করে বসে ছিল। তার মধ্যে আভিজাত্যের ছিটেফোঁটাও ছিল না। শুধু চোখ দুটো ছিল অসম্ভব মায়াবী আর চুলগুলো ছিল কোমর ছাড়িয়ে যাওয়া মেঘের মতো কালো।


আমার বন্ধুরা যখন তাদের স্ত্রীদের নিয়ে কফিশপে, রেস্তোরাঁয় বা আধুনিক পার্টিতে যেত, আমি তখন লজ্জায় ইতিকে নিয়ে বের হতে পারতাম না। একবার এক বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে ওকে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমার সব বন্ধুদের স্ত্রীরা দামী শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ আর হাল ফ্যাশনের পোশাকে সজ্জিত। তাদের মুখে অনর্গল ইংরেজি, কতো ধরনের আলোচনা। আর আমার ইতি? সে এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে বসে ছিল। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে শুধু মাথা নাড়ছিল আর মৃদু হাসছিল। সেই হাসিটা সুন্দর ছিল, কিন্তু সেই পরিবেশে বড্ড বেমানান লাগছিল। আমার বন্ধু রাহুলের স্ত্রী, একজন ডাক্তার, ইতির দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, "কিরে অনি, তোর বউ কথা বলে না নাকি? কোন গ্রাম থেকে তুলে এনেছিস?"


সেই রাতে আমার লজ্জায় মাথা কাটা গিয়েছিল। বাড়ি ফেরার পথে আমি ইতির সাথে একটা কথাও বলিনি। ও হয়তো আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরেছিল। গাড়িতে সারাপথ মাথা নিচু করে বসেছিল। বাড়ি ফিরে আমি যখন রাগে গজগজ করতে করতে নিজের ঘরে যাচ্ছিলাম, ও পেছন থেকে আস্তে করে ডেকেছিল, "শুনছেন?"


আমি না তাকিয়েই বলেছিলাম, "কী?"


"আমার জন্য আপনার খুব অপমান হলো, তাই না? আমি আর কখনো আপনার বন্ধুদের সামনে যাবো না।"


ওর গলাটা ধরে এসেছিল। কিন্তু আমার মনে কোনো দয়া হয়নি। বরং মনে হয়েছিল, এই মেয়েটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বোঝা। আমার স্ট্যাটাস, আমার সম্মান, সবকিছু এই গেঁয়ো মেয়েটার জন্য নষ্ট হতে বসেছে।


এরপর থেকে আমি ওকে সচেতনভাবে এড়িয়ে চলতাম। এক ছাদের নিচে থেকেও আমরা যেন দুজন দুই ভুবনের বাসিন্দা ছিলাম। আমি আমার জগৎ নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম, আর ও ওর ছোট জগৎ—রান্নাঘর, বারান্দার গাছ আর মায়ের সেবা—এসব নিয়ে পড়ে থাকতো। মা অবশ্য ইতিকে খুব ভালোবাসতেন। বলতেন, "এমন লক্ষ্মী বউ ভাগ্য করে পেতে হয়।" আমি মনে মনে হাসতাম। ভাবতাম, মা আর কী-ই বা বুঝবেন! ওনার কাছে তো ভালো রান্না করা আর সংসারের কাজ করাই বড় গুণ।


আমি নামাজে দাঁড়ালে আল্লাহর কাছে একটাই দোয়া করতাম—মুক্তি। এই দমবন্ধ করা সম্পর্ক থেকে, এই লোক দেখানো দাম্পত্য থেকে মুক্তি। আমি জানতাম না, মুক্তিটা ঠিক কীভাবে আসবে। ডিভোর্স দেওয়ার কথা ভাবিনি, কারণ তাতে মায়ের মনে কষ্ট দেওয়া হতো আর সমাজেও একটা বাজে প্রভাব পড়তো। তাই আমি অপেক্ষা করতাম, কোনো এক অলৌকিক ঘটনার জন্য।


সেই অলৌকিক ঘটনাটা ঘটল মাসখানেক আগে। হঠাৎ করেই ইতির জ্বর এলো। সাধারণ জ্বর ভেবে প্রথমে তেমন গুরুত্ব দিইনি। গ্রামের ডাক্তার এসে কিছু ঔষধপত্র দিয়ে গেলেন। কিন্তু জ্বর কমলো না, বরং বাড়তে থাকলো। ওর শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই সব শেষ। খুব সহজেই যেন সবকিছু ঘটে গেল। আমার প্রার্থনার ফল পেয়ে আমি ভেতরে ভেতরে উল্লাসিত হয়ে উঠেছিলাম, যদিও বাইরে থেকে কান্নার অভিনয় করতে কোনো ত্রুটি রাখিনি।


আত্মীয়-স্বজনরা এলো, গেলো। মায়ের কান্নায় বাড়ির বাতাস ভারী হয়ে থাকলো। কিন্তু আমার মন ছিল ফুরফুরে। আমি মনে মনে আমার ভবিষ্যৎ জীবনের পরিকল্পনা করতে শুরু করে দিয়েছিলাম। এবার আমি এমন একজনকে বিয়ে করব, যে আমার যোগ্য হবে। শিক্ষিত, স্মার্ট, আধুনিকা। যাকে নিয়ে আমি গর্বের সাথে আমার বন্ধুদের সামনে দাঁড়াতে পারব।


ইতির কুলখানির আয়োজন শেষ হতে না হতেই আমি মাকে বললাম, "মা, যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। জীবন তো আর থেমে থাকে না। আমি আবার বিয়ে করতে চাই।"


মা আমার কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লেন। ছলছল চোখে বললেন, "বাবা, কী বলছিস এসব? মেয়েটার কবরের মাটিও শুকায়নি!"


আমি ঠান্ডা গলায় বললাম, "মাটি শুকানোর সাথে জীবনের কী সম্পর্ক? আমি একা থাকতে পারবো না। আমার একজন সঙ্গীর প্রয়োজন।"


আমার জেদের কাছে মা হার মানলেন। হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, আমাকে আটকানো যাবে না। ঘটকের মাধ্যমে দ্রুত সম্বন্ধ আসতে শুরু করলো। আমি এবার নিজেই মেয়ে দেখতে গেলাম। তানিয়া। শহরের নামকরা কলেজের ইংরেজির লেকচারার। ফর্সা, সুন্দরী, স্মার্ট। কথা বললে মনে হয় যেন কতকিছু জানে। প্রথম দেখাতেই আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। তানিয়ার পরিবারও আমার মতো একজন সচ্ছল পাত্র পেয়ে খুশি হলো। সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো দ্রুতগতিতে এগিয়ে গেল।


ইতির মৃত্যুর ঠিক চারদিনের মাথায় আমি তানিয়াকে বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে এলাম। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনদের অবাক চাহনিকে উপেক্ষা করে আমি বিজয়ীর মতো হাসছিলাম। আজ আমার পাশে আমার স্বপ্নের রাজকন্যা। আমার যোগ্য একজন স্ত্রী।


রাতে তানিয়াকে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলাম। এই ঘরটা ইতির ছোঁয়ায় ভরা ছিল। ওর হাতের সেলাই করা বিছানার চাদর, ওর গুছিয়ে রাখা বইপত্র। আমি কাজের লোককে দিয়ে সব সরিয়ে ফেলেছিলাম। নতুন দামী চাদর বিছিয়েছি, ঘরে এয়ার ফ্রেশনার দিয়েছি। আমি চেয়েছিলাম ইতির সব স্মৃতি মুছে ফেলতে।


তানিয়া ঘরে ঢুকে চারদিকে তাকিয়ে নাক কুঁচকে বলল, "ঘরটা সুন্দর, কিন্তু কীসের যেন একটা গন্ধ আসছে। কেমন যেন সেকেলে, গ্রাম্য একটা গন্ধ।"


আমি অবাক হলাম। দামী এয়ার ফ্রেশনারের গন্ধে তো ঘর ম ম করার কথা। আমি নিজেও ভালো করে শ্বাস নিলাম। হ্যাঁ, একটা পরিচিত গন্ধ নাকে এসে লাগলো। এটা কোনো ফুলের গন্ধ নয়, কোনো পারফিউমের গন্ধও নয়। এটা ছিল ইতি ব্যবহার করা সস্তা জেসমিন তেলের গন্ধ আর তার সাথে মেশানো ছিল ওর শরীরের সেই নিজস্ব মায়াবী ঘ্রাণ। যে গন্ধটাকে আমি সবসময় ঘৃণা করে এসেছি, যে গন্ধটা আমার কাছে 'গেঁয়ো' মনে হতো, সেই গন্ধটাই যেন ঘরের প্রতিটি কোণায় মিশে আছে।


তানিয়ার কথায় আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল। আমি হাসার চেষ্টা করে বললাম, "কই, কিছু না তো!"


কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম, কিছু একটা রয়ে গেছে। ইতি নামের 'গেঁয়ো ভূত'টা হয়তো মরে গেছে, কিন্তু তার অস্তিত্বের ছাপ এত সহজে মুছে ফেলার নয়। দেয়ালে, বিছানায়, বাতাসে—সর্বত্র সে যেন অদৃশ্যভাবে বিরাজ করছে। আমার নতুন জীবনের শুরুতেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত উপলব্ধিটা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিলো। আমি কি সত্যিই মুক্তি পেয়েছি, নাকি এক নতুন কারাগারে প্রবেশ করলাম? উত্তরটা আমার জানা ছিল না।


#ইতিয়া

#সুমি আক্তার

#পর্ব ১

চলবে..

ভুল মাফ করবেন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url

sr7themes.eu.org